আগরতলা, ত্রিপুরা: ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুটের হার শূন্য শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ড. মানিক সাহা। UDISE+ তথ্যের ভিত্তিতে এই সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে ধরে রাখতে এবং তাদের ভিত্তিমূলক শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সাফল্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কয়েক বছর আগেও প্রাথমিক স্তরে কিছু শিশু স্কুল ছেড়ে দিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩–১৪ শিক্ষাবর্ষে ত্রিপুরায় প্রাথমিক স্তরের স্কুলছুটের হার ছিল ২.২১ শতাংশ। সেখান থেকে ২০২৫–২৬ সালে তা শূন্যে নামানো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুট শূন্য—এর অর্থ কী?
স্কুলছুট বা Dropout বলতে বোঝায়, কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করার আগেই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুট হলে শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষাই একজন শিশুর পড়াশোনার ভিত্তি তৈরি করে। এই সময়ে পড়া, লেখা, গণিত, সামাজিক আচরণ এবং শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। তাই এই পর্যায়ে শিশুকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রিপুরার ক্ষেত্রে ২০২৫–২৬ সালে প্রাথমিক স্তরে শূন্য শতাংশ স্কুলছুটের দাবি সেই দিক থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
কীভাবে এই সাফল্য এল?
মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে Foundational Literacy বা ভিত্তিমূলক সাক্ষরতা ও শিক্ষার মান উন্নত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এই সাফল্যের অন্যতম কারণ।
একজন শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে পড়াশোনা বুঝতে পারছে কি না, ক্লাসে আগ্রহী থাকছে কি না এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ তার জন্য উপযোগী কি না—এসব বিষয় স্কুলে ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নয়, শিশুকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং তার শেখার ভিত্তি শক্তিশালী করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
ভিত্তিমূলক শিক্ষার ওপর বাড়তি গুরুত্ব
শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রথম কয়েক বছরকে শক্তিশালী করার জন্য Foundation Literacy and Numeracy বা FLN-এর ওপর দেশজুড়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ত্রিপুরাতেও প্রাথমিক শিক্ষায় এই বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শিশু যদি প্রথম থেকেই পড়তে, লিখতে এবং সাধারণ গণিত বুঝতে পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিতে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
এ কারণে প্রাথমিক স্তরে শেখার পরিবেশ উন্নত করা স্কুলছুট কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু প্রাথমিক স্তর নয়, মাধ্যমিকেও উন্নতি
ত্রিপুরার শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্কুলছুটের হারও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০১৩–১৪ সালে Classes IX এবং X-এর dropout rate ছিল ২৫.৫১ শতাংশ। ২০২৫–২৬ সালে তা কমে ১০.৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাধ্যমিক স্তরেও স্কুলছুট কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
তবে এখানেই কাজ শেষ নয়। মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুট আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষায় চ্যালেঞ্জ
ত্রিপুরার প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে যেখানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, সেখানে স্কুলে শিশুদের ধরে রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকার এমন এলাকায় কম ছাত্রসংখ্যার বিদ্যালয়গুলিকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। কম ভর্তি থাকা বিদ্যালয়গুলিকে একত্রিত করে আধুনিক আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।
এর লক্ষ্য হলো প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাও যেন উন্নত শিক্ষার সুযোগ পায়।
Balvatika ও প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন উদ্যোগ
শিশুদের স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য Balvatika-র মতো উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় যাওয়ার আগে শিশুর ভাষা, সামাজিক আচরণ, সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা এবং শেখার অভ্যাস তৈরি করা গেলে প্রথম দিকের শ্রেণিগুলিতে পড়াশোনার চাপ কমে এবং শিশুর শেখার আগ্রহ বাড়তে পারে।
ত্রিপুরায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে Balvatika সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের ভূমিকা
শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুলছুট কমানো শুধু একটি উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, শিশুদের মৌলিক চাহিদা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়।
কেন্দ্রের Samagra Shiksha-র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, লাইব্রেরি এবং ডিজিটাল শিক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া হয়।
এই ধরনের পরিকাঠামোগত উন্নয়নও শিশুদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মাধ্যমিক শিক্ষা
প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুট শূন্য হওয়া নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রাথমিকের পরবর্তী ধাপেও ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অনেক সময় প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর মাধ্যমিক স্তরে এসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে। আর্থিক সমস্যা, দূরত্ব, পারিবারিক পরিস্থিতি, পড়াশোনায় দুর্বলতা বা বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া—বিভিন্ন কারণ এর পেছনে থাকতে পারে।
তাই প্রাথমিক স্তরের এই সাফল্যকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও নিয়ে যাওয়াই এখন বড় লক্ষ্য।
সরকারের সামনে পরবর্তী লক্ষ্য কী?
মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের স্কুলছুটের হারও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। একইসঙ্গে স্কুলশিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে transition rate বা এক শ্রেণি থেকে পরবর্তী স্তরে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার হার উন্নত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ শুধু প্রাথমিক স্তরে শিশুদের স্কুলে রাখা নয়, তাদের মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
স্কুলছুট কমানোর ক্ষেত্রে শুধু সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট নয়। অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ পাচ্ছে কি না, কোনো সমস্যার কারণে স্কুলে যেতে চাইছে না কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে কোনো শিশু পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ার আগেই তার সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব।
ত্রিপুরার জন্য এই সাফল্যের গুরুত্ব
প্রাথমিক স্তরে শূন্য শতাংশ স্কুলছুটের তথ্য ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক মাইলফলক। ২০১৩–১৪ সালের ২.২১ শতাংশ থেকে ২০২৫–২৬ সালে শূন্যে পৌঁছানো দেখায় যে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার ফল পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই সাফল্যকে স্থায়ী করতে হলে নিয়মিত তথ্য যাচাই, বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন এবং প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সহজ transition নিশ্চিত করা জরুরি।
শেষ কথা
ত্রিপুরায় “স্কুলছুট শূন্য” হওয়ার খবর রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অবশ্যই একটি আশাব্যঞ্জক ঘটনা। তবে প্রকৃত সাফল্য তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন প্রাথমিক স্তরের পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও স্কুলছুট আরও কমবে এবং প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিটি শিশু মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রাথমিক স্তরে ০ শতাংশ dropout এখন ত্রিপুরার জন্য একটি নতুন মাইলফলক। আগামী দিনে এই সাফল্য কতটা ধরে রাখা যায় এবং মাধ্যমিক স্তরের স্কুলছুট কতটা কমানো যায়—সেদিকেই নজর থাকবে।
Frequently Asked Questions (FAQ)
১. ২০২৫–২৬ সালে ত্রিপুরায় প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুটের হার কত?
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে ত্রিপুরায় প্রাথমিক স্তরে (ক্লাস I–V) স্কুলছুটের হার ০ শতাংশ হয়েছে বলে UDISE+ তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা। অর্থাৎ ওই শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুটের হার শূন্যে নেমে এসেছে।
২. ত্রিপুরায় স্কুলছুট শূন্য হওয়ার কারণ কী?
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে ভিত্তিমূলক সাক্ষরতা ও শিক্ষার মান (Foundational Literacy) শক্তিশালী করার জন্য ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়ার ফলেই এই অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে ধরে রাখা এবং স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৩. ২০১৩–১৪ সালে ত্রিপুরায় প্রাথমিক স্কুলছুটের হার কত ছিল?
UDISE+ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩–১৪ শিক্ষাবর্ষে ত্রিপুরায় প্রাথমিক স্তরের স্কুলছুটের হার ছিল ২.২১ শতাংশ। ২০২৫–২৬ সালে সেই হার কমে ০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকেরও বেশি সময়ে প্রাথমিক স্তরে স্কুলছুটের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
৪. ত্রিপুরায় মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার কত?
ক্লাস IX ও X-এর ক্ষেত্রে স্কুলছুটের হার ২০১৩–১৪ সালের ২৫.৫১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫–২৬ সালে ১০.৪০ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ মাধ্যমিক স্তরেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যদিও প্রাথমিক স্তরের মতো এখনও তা শূন্যে পৌঁছায়নি।
৫. আগামী দিনে ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে লক্ষ্য কী?
সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো আগামী ৩–৪ বছরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের স্কুলছুটের হার আরও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং স্কুলশিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার হার বা transition rate উন্নত করা। প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় কম ছাত্রসংখ্যার বিদ্যালয়ের সমস্যা মোকাবিলায় আধুনিক আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

0 Comments