ত্রিপুরা বিজেপির সংগঠন নিয়ে দলের অন্দরেই কি বাড়ছে প্রশ্ন? মণ্ডল থেকে জেলা—যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও তৃণমূলের কর্মীদের গুরুত্ব কতটা?
ত্রিপুরার রাজনীতিতে বিজেপি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালে দলের রাজ্য নেতৃত্বে পরিবর্তন হয়েছে। বিধায়ক অভিষেক দেবরায়কে ত্রিপুরা বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি করা হয়েছে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দলের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বুথ স্তর পর্যন্ত কর্মীদের সক্রিয় রাখা।নেতৃত্বের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা এবং নেতৃত্বের ভাষা গুলি সমঝোতার মধ্যে রেখে কথা বলা। কিন্তু অতন্ত্য দুঃখের বিষয় ওদের ভাষা গুলি এত পরিবর্তন যা সাধারণ মানুষ মেনেনিতে পারে না ।
কিন্তু এর মধ্যেই দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে।
দলের কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং বুথ-মণ্ডল স্তরে কাজ করা কিছু কর্মী প্রত্যাশিত গুরুত্ব পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা কিছু ব্যক্তিও বিভিন্ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ,গোমতী জেলা কমিটিতে রয়েছেন টেপানিয়ার যার নূন্যতম সাধারণ মানুষের সমর্থন নেই, আপনারা ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে দেখুন? কর্মীরা এর থেকে বেশী কিছু বলতে চায়না - আমরা কর্মীদের অভিযোগ মুলে বলছি ।
এই অভিযোগগুলির সত্যতা দলীয়ভাবে যাচাই করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন যদি কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে নেতৃত্বের কাছেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
মণ্ডল থেকে জেলা—যোগ্যতার মূল্যায়ন কীভাবে হচ্ছে?
একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি তার সংগঠনের ভিতরে।
বুথ কমিটি, মণ্ডল কমিটি, জেলা কমিটি কিংবা বিভিন্ন ভোট কমিটি—প্রতিটি স্তরেই এমন কর্মী দরকার, যারা মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
নির্বাচনের আসল লড়াই হয়—
বুথে, পাড়ায়, গ্রামে এবং সাধারণ মানুষের দরজায়।
যে কর্মী বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন, ভোটের সময় বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, দলের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং মানুষের সমস্যার কথা নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছেন—তার অভিজ্ঞতাকে কি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ব্যক্তিগত পছন্দ নাকি সাংগঠনিক যোগ্যতা?
রাজনীতিতে একজন বিধায়ক বা মন্ত্রীর নিজের পছন্দের মানুষ থাকতে পারেন। কিন্তু সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তিগত পছন্দ যোগ্যতা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার উপরে চলে আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব দলের উপর পড়তে পারে।
দলের কর্মীদের একাংশের মধ্যে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সাংগঠনিক দায়িত্বে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।
এরপর আরো, কিছু কিছু গ্রামের প্রধান/উপপ্রধান এদের কথা বলার ধরণ গড়ন বিজ্ঞ বিজ্ঞ, সে শিক্ষিত হোক আর বা না হোক সেই বামেদের মত আচার আচরণ । সাধারণ মানুষের অভিযোগ অন্ততপক্ষে বি জে পি সরকারের আমলে এই সব হতে পারেনা । বামফ্রণ্টকে হটিয়েছে এই অতিষ্ট সাধারণ মানুষেরা, কিন্তু মূল্যায়ন কোথায় ?
এখানে আবারও প্রশ্ন—
দল কি ব্যক্তিকে দেখে পদ দিচ্ছে, নাকি কর্মীর সাংগঠনিক কাজের মূল্যায়ন করে দায়িত্ব দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কারণ বিজেপি শুধুমাত্র কয়েকজন মন্ত্রী, বিধায়ক বা নেতার দল নয়।
বিজেপির আসল শক্তি তার লক্ষ লক্ষ কর্মী এবং সমর্থক এবং পার্টি সংবিধান ।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, কিন্তু রাজনৈতিক দক্ষতা কোথায়?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হলেই তিনি অযোগ্য—এমনটা বলা যায় না।
অনেক কম শিক্ষিত মানুষও অত্যন্ত দক্ষ রাজনৈতিক সংগঠক হতে পারেন।
কিন্তু একজন সংগঠকের মধ্যে কিছু মৌলিক গুণ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
যেমন—
• সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলার ক্ষমতা
• কর্মীদের সম্মান করার মানসিকতা
• মানুষের সমস্যা বোঝার ক্ষমতা
• দলের নীতি সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা
• সাংগঠনিক শৃঙ্খলা
• বুথ স্তরে সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা
• বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রচারের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা
এই গুণগুলি যদি না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র কোনও প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়া উচিত কি না—সেটিই প্রশ্ন।
মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরনও দলের ভাবমূর্তি তৈরি করে
একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মীর কাছে যান, তখন তিনি প্রথমে দলের বড় নেতাকে দেখেন না।
তিনি দেখেন স্থানীয় কর্মীকে।
সেই কর্মী কীভাবে কথা বলছেন, মানুষের সমস্যা শুনছেন কি না, সাধারণ মানুষকে সম্মান করছেন কি না—এসবের উপরেই অনেক সময় দলের ভাবমূর্তি নির্ভর করে।
একজন কর্মী যদি মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, মানুষের কথা শুনতে না চান বা নিজেকে সাধারণ মানুষের উপরে মনে করেন, তাহলে তার প্রভাব শুধু সেই ব্যক্তির উপর পড়ে না।
তার প্রভাব পড়ে পুরো দলের ভাবমূর্তির উপর।
তাই সাংগঠনিক পদ দেওয়ার সময় নেতৃত্বের উচিত শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আচরণকেও গুরুত্ব দেওয়া।
“এক ব্যক্তি, এক পদ”—নীতি নিয়ে প্রশ্ন
বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একই ব্যক্তি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলে অন্য যোগ্য কর্মীদের জন্য সুযোগ কতটা থাকে?
“এক ব্যক্তি, এক পদ”—এই নীতির মূল উদ্দেশ্য যদি হয় দায়িত্বের সুষ্ঠু বণ্টন এবং আরও বেশি কর্মীকে নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া, তাহলে সেটি বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
কারণ একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই কয়েকজন ব্যক্তি যদি বারবার বিভিন্ন দায়িত্বে থাকেন, তাহলে নিচের স্তরের কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
আর সেই হতাশা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব নির্বাচনের সময় দেখা যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীতি বনাম রাজ্যের বাস্তবতা
বিজেপি একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল।
দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, দায়িত্বের বণ্টন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার উপর জোর দেয়।
ত্রিপুরাতেও সাম্প্রতিক সময়ে জেলা ও বিভিন্ন মোর্চার দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের খবর সামনে এসেছে।
কিন্তু কাগজে-কলমে সাংগঠনিক পরিবর্তন আর বাস্তবে কর্মীদের সন্তুষ্ট রাখা—দুটি এক বিষয় নয়।
নেতৃত্বের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো—
যে কর্মী মাঠে কাজ করছেন, তার কণ্ঠস্বর কি রাজ্য নেতৃত্ব পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে?
যদি না পৌঁছায়, তাহলে সাংগঠনিক কাঠামো যতই বড় হোক, ভিত দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ত্রিপুরায় এখন সংগঠন শক্তিশালী করার সময়
২০২৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ত্রিপুরায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে আগামী দিনের নির্বাচন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে TTAADC-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি ও TIPRA Motha-র রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
আর সংগঠন শক্তিশালী করার প্রথম শর্ত হলো—
কর্মীদের কথা শোনা।
যারা কঠিন সময়ে দলের পাশে ছিলেন, তাদের কী হবে?
রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে এমন অনেক কর্মী থাকেন যারা ক্ষমতার সময় সামনে থাকেন না, কিন্তু কঠিন সময়ে দলকে ধরে রাখেন।
তারা নিজের অর্থ খরচ করেন।
সময় দেন।
পরিবারকে সময় না দিয়ে দলের জন্য কাজ করেন।
বাড়ি বাড়ি যান।
মানুষের সমস্যার কথা শোনেন।
বুথে বসেন।
নির্বাচনের সময় দিন-রাত পরিশ্রম করেন।
কিন্তু যখন দল ক্ষমতায় আসে, তখন যদি সেই কর্মীরাই পিছিয়ে পড়েন এবং নতুন করে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে যান—তাহলে কর্মীদের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দলের জন্য কর্মী কি শুধুই নির্বাচনের সময় দরকার?
নাকি ক্ষমতায় আসার পরও কর্মীর সম্মান এবং মতামতের মূল্য থাকবে?
আগামী বিধানসভা নির্বাচনই দেবে অনেক প্রশ্নের উত্তর
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে জনগণ।
আজ একজন মন্ত্রী।
কাল অন্য কেউ।
আজ একজন বিধায়ক।
আগামী নির্বাচনে হয়তো অন্য কেউ।
কিন্তু সাধারণ মানুষ একই থাকে।
ভোটার সবকিছু দেখেন।
কে মানুষের পাশে ছিলেন, কে মানুষের সমস্যা শুনেছেন, কে কর্মীদের সম্মান করেছেন এবং কে শুধুমাত্র নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন—এই হিসাব ভোটের সময় সামনে আসতেই পারে।
তাই ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই সংগঠনের ভিত শক্তিশালী করা দরকার।
বিজেপির জন্য সতর্কবার্তা নাকি সুযোগ?
ত্রিপুরা বিজেপির বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র সমালোচনার চোখে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
বরং এটিকে একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
দলের নতুন রাজ্য নেতৃত্ব চাইলে তৃণমূল স্তর থেকে মতামত সংগ্রহ করতে পারে।
প্রতিটি মণ্ডলে কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করা যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের কর্মীদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
বুথভিত্তিক সংগঠনের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা যেতে পারে।
কোন কর্মী মানুষের সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রাখছেন, তা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বদলে সাংগঠনিক যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা: ২০২৮-এর আগে কি আত্মসমালোচনার সময়?
এই লেখা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।
এটি দলের ভেতরে থাকা কিছু প্রশ্নকে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টা।
যদি অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন হয়, তাহলে দলীয় নেতৃত্ব তথ্য দিয়ে তা পরিষ্কার করতে পারে।
আর যদি কোথাও সত্যিই সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকে, তাহলে এখনই তা সংশোধনের সময়।
কারণ নির্বাচন আসার পরে ভুল সংশোধনের সময় খুব কম থাকে।
বুথ শক্তিশালী না হলে মণ্ডল শক্তিশালী হবে না।
মণ্ডল শক্তিশালী না হলে জেলা শক্তিশালী হবে না।
আর তৃণমূল কর্মীকে সম্মান না করলে সংগঠনের ভিতও শক্তিশালী হবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
ত্রিপুরা বিজেপি কি কর্মীভিত্তিক সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগ আরও জোরালো হবে?
এর উত্তর এখনই হয়তো পাওয়া যাবে না।
কিন্তু ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচন যখন সামনে আসবে, তখন মানুষের রায়ই সবচেয়ে বড় উত্তর হয়ে দাঁড়াবে।
নোট: আমাদের সংবাদ মাধ্যম কারও বিরুদ্ধে লিখে না সত্য প্রচার করাটাকে গুরুত্ব দেয় । তাই সমস্ত কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হলো। এটা সংবাদ মাধ্যমের নিজস্ব লেখা নয় ।

0 Comments