ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC)-এর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন। কিন্তু খুব কম মানুষই চূড়ান্ত সাফল্যের মুখ দেখতে পারেন। এই কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেই নিজের অসাধারণ অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে নতুন ইতিহাস গড়েছেন আইএএস মইন আহমেদ মনসুরি।
একসময় জীবিকা নির্বাহের জন্য উত্তর প্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রামে সাইবার ক্যাফে চালাতেন তিনি। পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে নিতে হয়েছিল ৩ লক্ষ টাকার ঋণ। টানা তিনবার UPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেও তিনি স্বপ্ন ছাড়েননি। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় সর্বভারতীয় র্যাঙ্ক (AIR) ২৯৬ অর্জন করে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (IAS) নির্বাচিত হন।
বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি সদর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট (SDM) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই সাফল্যের গল্প আজ দেশের অসংখ্য UPSC প্রার্থীর কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা।
ছোট গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে শুরু
মইন আহমেদ মনসুরির জন্ম উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার ঠাকুরদ্বারা তহসিলের জাতপুরা গ্রামের একটি সাধারণ পরিবারে।
তাঁর বাবা ওয়ালি হাসান পেশায় একজন চালক।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই সীমিত ছিল। ছোটবেলা থেকেই সংসারের অভাব-অনটন দেখেই বড় হয়েছেন তিনি।
অভাবের মধ্যেও তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই উচ্চশিক্ষা এবং পরে UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সংসার চালাতে খুলেছিলেন সাইবার ক্যাফে
২০১৮ সালে বড় ভাই মহসিন মনসুরির সঙ্গে মিলে একটি ছোট সাইবার ক্যাফে চালু করেন মইন।
এই ব্যবসাই ছিল পরিবারের আয়ের অন্যতম ভরসা।
সাইবার ক্যাফে পরিচালনার পাশাপাশি তিনি UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। দিনে কাজ এবং রাতে পড়াশোনা—এভাবেই চলছিল তাঁর জীবন।
অনেক সময় ক্যাফের কাজ শেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয়েছে। তবুও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যাননি।
UPSC প্রস্তুতির জন্য নিলেন ৩ লক্ষ টাকার ঋণ
UPSC প্রস্তুতির জন্য দিল্লিতে যাওয়া ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা ছিল অর্থ।
তাঁর বাবার পক্ষে এত বড় খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না।
তখন তিনি নিজের সাইবার ক্যাফের বিপরীতে ১.৫ লক্ষ টাকার ব্যবসায়িক ঋণ নেন।
বাকি ১.৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেন তাঁর দাদা ইবনে হাসানের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC)-এর মাধ্যমে।
মোট ৩ লক্ষ টাকা নিয়ে তিনি দিল্লিতে UPSC প্রস্তুতির জন্য রওনা দেন।
প্রথম তিনবার ব্যর্থতা, তবুও হার মানেননি
২০১৯ সালে প্রথমবার UPSC পরীক্ষায় অংশ নেন মইন।
কিন্তু তিনি প্রিলিমিনারি পরীক্ষাই উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
পরবর্তী দুই প্রচেষ্টাতেও একই ফল হয়।
একজন সাধারণ পরীক্ষার্থীর জন্য টানা তিনবার ব্যর্থতা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু মইন ব্যর্থতাকে শেষ নয়, বরং শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি নিজের ভুল বিশ্লেষণ করেন, পড়াশোনার কৌশল পরিবর্তন করেন এবং আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুতি চালিয়ে যান।
অর্থ শেষ হয়ে গেলে পাশে দাঁড়ায় আতিয়া ফাউন্ডেশন
দিল্লিতে পড়াশোনার সময় খুব দ্রুত তাঁর সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে যায়।
ঋণের চাপও বাড়তে থাকে।
ঠিক সেই সময় তিনি করোল বাগের আতিয়া ফাউন্ডেশন সম্পর্কে জানতে পারেন।
এই সংস্থা মেধাবী অথচ আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে।
মইনের নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং লক্ষ্য দেখে সংস্থাটি তাঁর পরবর্তী UPSC প্রস্তুতির সম্পূর্ণ খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সহায়তা তাঁর জীবনে এক বড় মোড় এনে দেয়।
চতুর্থ প্রচেষ্টায় মিলল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য
টানা তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও তিনি হাল ছাড়েননি।
চতুর্থ প্রচেষ্টায় তিনি UPSC Civil Services Examination-এ All India Rank 296 অর্জন করেন।
এই সাফল্যের মাধ্যমে তাঁর বহু বছরের কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং সংগ্রাম সফলতায় পরিণত হয়।
তিনি ২০২৩ ব্যাচের IAS অফিসার হিসেবে নির্বাচিত হন।
বর্তমানে জলপাইগুড়ির SDM
সম্প্রতি তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি সদর মহকুমার SDM ও Sub-Divisional Magistrate হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
৪ জুলাই ২০২৬ তিনি নিজের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের খবর শেয়ার করেন।
তিনি পোস্টে লেখেন—
"SDO & SDM, Sadar Jalpaiguri 😊"
এই পোস্ট প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে কী বললেন মইন?
এক সাক্ষাৎকারে মইন আহমেদ মনসুরি জানান—
তিনি কখনও নিজের দারিদ্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি।
বরং সেটাকেই শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
তিনি বলেন, সাইবার ক্যাফে চালানোর পাশাপাশি UPSC প্রস্তুতি নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না।
সংসার চালানো, ঋণের চাপ এবং পড়াশোনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে।
তবে লক্ষ্য যদি পরিষ্কার থাকে, তাহলে কঠিন পথও একদিন সহজ হয়ে যায়।
UPSC পরীক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বার্তা
মইনের মতে—
• ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়।
• নিজের ভুল বিশ্লেষণ করুন।
• প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়ুন।
• অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না।
• আত্মবিশ্বাস কখনও হারাবেন না।
• ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।
তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও ধৈর্য থাকলে সাধারণ পরিবার থেকেও দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে পৌঁছানো সম্ভব।
কেন ভাইরাল হচ্ছে তাঁর সাফল্যের গল্প?
মইনের গল্প সাধারণ মানুষের কাছে এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো—
✔ দারিদ্র্যকে জয় করেছেন।
✔ নিজের ব্যবসা চালিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
✔ ঋণ নিয়ে UPSC প্রস্তুতি করেছেন।
✔ টানা তিনবার ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়েননি।
✔ চতুর্থ প্রচেষ্টায় IAS হয়েছেন।
✔ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।
তরুণদের জন্য বড় শিক্ষা
আজকের দিনে অনেকেই একবার ব্যর্থ হলেই হতাশ হয়ে পড়েন।
কিন্তু মইন আহমেদ মনসুরির জীবন দেখিয়ে দেয়—
স্বপ্ন পূরণ করতে অর্থের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি।
পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য একদিন অবশ্যই আসে।
তাঁর গল্প শুধু UPSC পরীক্ষার্থীদের নয়, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সংগ্রাম করা প্রতিটি মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
উপসংহার
সাইবার ক্যাফের মালিক থেকে IAS অফিসার—মইন আহমেদ মনসুরির এই যাত্রা ভারতের অসংখ্য তরুণের কাছে আশার আলো।
৩ লক্ষ টাকার ঋণ, টানা তিনবার ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট—সব বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
বর্তমানে জলপাইগুড়ির SDM হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং লক্ষ লক্ষ স্বপ্নবাজ তরুণের জন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
FAQ
১. মইন আহমেদ মনসুরি কে?
তিনি ২০২৩ ব্যাচের একজন IAS অফিসার এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি সদর মহকুমার SDM হিসেবে কর্মরত।
২. তিনি কত টাকা ঋণ নিয়েছিলেন?
UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মোট ৩ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
৩. তিনি কতবার UPSC পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিলেন?
প্রথম তিনটি প্রচেষ্টায় তিনি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
৪. কত নম্বর র্যাঙ্ক পেয়েছিলেন?
চতুর্থ প্রচেষ্টায় UPSC-তে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ২৯৬ অর্জন করেন।
৫. আগে তিনি কী কাজ করতেন?
তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে একটি সাইবার ক্যাফে পরিচালনা করতেন।

0 Comments