তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের কড়া বার্তা, ‘সব প্রাসঙ্গিক ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় নেওয়া হবে’ | সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের ভূমিকা নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া, কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন অধ্যায় 

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তিস্তা নদী প্রকল্প। বাংলাদেশে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (TRCMRP) চীনের সহযোগিতার ঘোষণা ঘিরে ভারতের প্রতিক্রিয়া নতুন করে কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। 

তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক আলোচনা


ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তিস্তা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নির্ধারণে "সমস্ত প্রাসঙ্গিক ঘটনাপ্রবাহ" বিবেচনায় নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মন্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিতও বহন করে। 

  কী ঘটেছে? 

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করেন এবং বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। 

এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। 

সেখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়— 

    • তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা। 
    • সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞ সহায়তা। 
    • নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়নে সহযোগিতা। 

 চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা করবে। 

  ভারতের প্রতিক্রিয়া কী? 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, 

"বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা পারস্পরিকভাবে সম্মত রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং সময়ে সময়ে তা পর্যালোচনা করা হয়।" 

তিনি আরও জানান, 

      •এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। 
      • ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করা হবে। 

 যদিও তিনি সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করেননি, তবে পর্যবেক্ষকদের মতে বক্তব্যটি মূলত তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততাকেই ইঙ্গিত করে। 

 কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদী?

 তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। 

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ ব্যবস্থা এবং জীবিকার সঙ্গে এই নদীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। 

শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। 

  চীনের প্রস্তাব কী? 

যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী— 

     • তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা 
     • সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা 
     • পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ সহযোগিতা 
     • অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা 

 চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়িং বাংলাদেশকে "পূর্ণ সহযোগিতা" দেওয়ার আশ্বাস দেন। 
 
বাংলাদেশের অবস্থান 

বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মতে— 

      • প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের ভেতরে বাস্তবায়িত হবে। 
      • তাই এটি ভারতের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। 
      • তবে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন চুক্তি অপরিহার্য। 

 অর্থাৎ প্রকল্প এবং পানি বণ্টন—এই দুই বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। 

  TRCMRP কী? 

TRCMRP (Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project) হলো— 

       • নদী পুনরুদ্ধার 
       • নদী শাসন 
       • বন্যা নিয়ন্ত্রণ 
       • নদীতীর সংরক্ষণ 
       • কৃষি উন্নয়ন 
       • পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা 

 এই লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত একটি বৃহৎ প্রকল্প। 

এটি সরাসরি পানি বণ্টন চুক্তির বিকল্প নয়। 

 প্রকল্পের ইতিহাস

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২০ সালে। 

সে সময় বাংলাদেশ— 

      • মোট প্রকল্প ব্যয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার 
      • চীনের কাছে ৭২৫ মিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণ চেয়েছিল। 

 এরপর বিষয়টি ধীরে ধীরে কৌশলগত গুরুত্ব পেতে শুরু করে। 

  ২০২৫ সালে কী পরিবর্তন হয়? 

২০২৫ সালের মার্চে বেইজিং সফরের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকার যৌথ বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো TRCMRP-এ চীনের ভূমিকা স্বাগত জানায়। 

পরবর্তীতে মে মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বেইজিংয়ের অংশগ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে চাওয়া হয়। 

  ভারতের উদ্বেগ কোথায়? 

ভারতের প্রধান উদ্বেগের কারণ— 

১. শিলিগুড়ি করিডোর 

তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। 

এই করিডোরকে অনেকেই "চিকেনস নেক" নামে চেনেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

২. চীনের কৌশলগত উপস্থিতি 

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগকে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়ন করে। 

তাই তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে নতুন উদ্বেগের বিষয় নয়। 

  ভারতের আগের প্রস্তাব 

২০২৪ সালে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা ঢাকা সফরের সময় ভারত নিজেই তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। 

বিশ্লেষকদের মতে— 

এটি ছিল চীনকে প্রকল্প থেকে দূরে রাখার একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ। 

  শেখ হাসিনার সময় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল? 

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন— 

ভারত তিস্তা প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে পাঠাবে। 

এই সিদ্ধান্তও প্রকল্পে ভারতের সক্রিয় আগ্রহের ইঙ্গিত বহন করেছিল। 

  সাম্প্রতিক অবস্থান 

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রী জানান— 

ভারত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। 

এতে বোঝা যায়, নয়াদিল্লি এখনো কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়। 

  তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি কেন এখনো হয়নি? 

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির খসড়া ২০১১ সালেই প্রস্তুত হয়েছিল। 

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের কৃষি স্বার্থের কথা উল্লেখ করে আপত্তি জানান। 

এরপর থেকেই চুক্তিটি কার্যত স্থগিত রয়েছে। প্রায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অচলাবস্থা চলছে। 

  বর্তমান পরিস্থিতি 

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে— 

নতুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হওয়ার পর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনা এগোতে পারে। 

অন্যদিকে ভারতও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। 

  বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে তিস্তা প্রকল্প কেবল একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়। 

এটি এখন— 

      • আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, 
      • ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, 
      • বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল, 
      • এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। 

 বাংলাদেশ উন্নয়নের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইলেও, ভারত তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। 


  উপসংহার 

তিস্তা নদীকে ঘিরে ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তা ও পানি-বণ্টন সংক্রান্ত উদ্বেগ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি এবং চীনের ভূমিকা এই ইস্যুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

0 Comments