তেহরান: প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেইয়ের জানাজায় ভারতীয় প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির জন্য ভারত সরকার ও দেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ইরান। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কঠিন সময়ে ভারতের সংহতি, সহমর্মিতা এবং সম্মান প্রদর্শন দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।
ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, "আমরা এই বন্ধুত্ব কখনো ভুলব না।" তাদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলের তেহরান সফর
গত শুক্রবার একটি উচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছে প্রয়াত ইরানি নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন—
• বিহারের রাজ্যপাল ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন
• পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা
এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন—
• কংগ্রেস নেতা সালমান খুরশিদ
• জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং পিডিপি প্রধান মেহবুবা মুফতি
• শিখ, হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতারা
এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণকে ইরান দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখছে।
ইরানের দূতাবাস কী বলেছে?
ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বার্তায় ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী—
"বন্ধুত্ব, সহানুভূতি এবং সম্মানের এই নিদর্শন তেহরান কখনো ভুলবে না।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারত সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, ধর্মীয় নেতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি ইরানকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
ইরানের মতে, এই সংহতি ভবিষ্যতেও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
ভারত-ইরান সম্পর্কের নতুন বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল একটি শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নয়; বরং এটি ভারত ও ইরানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে—
• ঐতিহাসিক সম্পর্ক
• সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
• জ্বালানি সহযোগিতা
• বাণিজ্যিক সম্পর্ক
• আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা
সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে, এই সফরকে তারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জানাজায় লাখো মানুষের ঢল
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের জানাজার মিছিল শুরু হয়।
এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জনসমাগম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসেন।
খামেনেই ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কফিন ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল এবং একটি বিশেষভাবে সাজানো ট্রাকে বহন করা হয়।
হাজার হাজার মানুষ কফিন স্পর্শ করার চেষ্টা করেন।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক ব্যবস্থা নিতে হয়।
প্রচণ্ড গরমের কারণে ভিড়ের মধ্যে পানি ছিটানো হয় এবং লাউডস্পিকারের মাধ্যমে জনগণকে ধাক্কাধাক্কি না করার আহ্বান জানানো হয়।
মাশহাদে দাফনের প্রস্তুতি
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তা হাসান হাসানজাদেহ জানান, দীর্ঘ শোকযাত্রার পর কফিনগুলো তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে।
এরপর খামেনেইকে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজা মাজারে দাফন করা হবে।
ইরানে জাতীয় শোক পালনের সময় সরকারি কার্যক্রম সীমিত রাখা হয়েছে এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
খামেনেইয়ের মৃত্যু ও জানাজাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ভারতের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত উভয় পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের এই সংহতি ভবিষ্যতের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করবে।
পশ্চিম এশিয়ার সংকট ও ভারতের ভূমিকা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে ভারত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইরানের কর্মকর্তারা অতীতেও ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশংসা করেছেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে—
• সংকটকালে ভারতের অবস্থান ইতিবাচক ছিল।
• হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
• ভারত ও ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
ভারত ও ইরানের সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো।
দুই দেশের মধ্যে রয়েছে—
• প্রাচীন বাণিজ্য
• ভাষাগত প্রভাব
• সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিনিময়
• ধর্মীয় যোগাযোগ
• জ্বালানি সহযোগিতা
বর্তমান সময়েও চাবাহার বন্দরসহ একাধিক প্রকল্প দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
কূটনৈতিক বার্তার তাৎপর্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, শোকের সময় এক দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়।
এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রতি আস্থা, সম্মান এবং সহযোগিতার বার্তা বহন করে।
ইরানের প্রকাশিত বিবৃতি থেকেও সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে।
উপসংহার
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেইয়ের জানাজায় ভারতীয় প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণকে ইরান কেবল একটি কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছে না; বরং এটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইরানের ভাষায়, "আমরা এই বন্ধুত্ব কখনো ভুলব না।" এই মন্তব্য ভবিষ্যতে ভারত-ইরান সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
#ভারত # ইরান #আন্তর্জাতিক সংবাদ #পশ্চিম এশিয়া #তেহরান #কূটনীতি #খামেনেই #আন্তর্জাতিক সম্পর্ক #বিশ্ব সংবাদ #Middle East #India Iran
Relations #Bangladesh

0 Comments