আগরতলা, ত্রিপুরা: ত্রিপুরায় প্রিপেড স্মার্ট মিটার ব্যবস্থা চালুর পর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে রিচার্জের বিপরীতে পাওয়া ইউনিট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রিচার্জ করার পর প্রত্যাশার তুলনায় অত্যন্ত কম ইউনিট ব্যালেন্স দেখা যাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে কয়েক হাজার টাকা রিচার্জের পরও ব্যালেন্সে মাত্র কয়েক দশক ইউনিট দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গ্রাহকদের একাংশের দাবি, ₹২,০০০ রিচার্জ করার পর কোথাও প্রায় ৪০ ইউনিট, কোথাও ৯৭ ইউনিট, আবার কোথাও মাত্র ১৪ ইউনিটের মতো ব্যালেন্স দেখা যাচ্ছে। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রে কত টাকা থেকে কত ইউনিট পাওয়ার কথা, তার নির্দিষ্ট হিসাব, ট্যারিফ, সরকারি চার্জ, পূর্বের বকেয়া বা অন্যান্য কর্তনের তথ্য যাচাই না করে সরাসরি মিটারকে ভুল বলা যাবে না। তাই এই অভিযোগগুলির স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।
প্রিপেড ব্যবস্থার মূল কথা কী?
প্রিপেড স্মার্ট মিটার ব্যবস্থায় গ্রাহক আগে টাকা জমা বা রিচার্জ করেন এবং সেই অর্থের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিপুরায় Revamped Distribution Sector Scheme (RDSS)-এর আওতায় বিপুল সংখ্যক স্মার্ট প্রিপেড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং মোবাইল রিচার্জের মতো প্রিপেমেন্ট পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে রিচার্জের পর গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে কত ইউনিট যোগ হচ্ছে, কী কী চার্জ কাটা হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যালেন্স হিসাব করা হচ্ছে—এই বিষয়গুলি যদি সাধারণ মানুষ পরিষ্কারভাবে বুঝতে না পারেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
₹২,০০০ রিচার্জে এত কম ইউনিট কেন?
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন গ্রাহক যদি ₹২,০০০ রিচার্জ করেন এবং তাঁর মিটারে মাত্র ১৪, ৪০ বা ৯৭ ইউনিটের মতো ব্যালেন্স দেখায়, তাহলে সেই হিসাবটি কীভাবে তৈরি হয়েছে—তা পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার।
এর মধ্যে থাকতে পারে বিদ্যুতের নির্ধারিত ট্যারিফ, ফিক্সড চার্জ, বিভিন্ন সরকারি বা নিয়ন্ত্রক চার্জ, পূর্ববর্তী কোনো বকেয়া সমন্বয় অথবা অন্য কোনো প্রযোজ্য কর্তন। কিন্তু গ্রাহক যদি এসবের বিস্তারিত হিসাব না পান, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সেই কারণেই গ্রাহকদের দাবি, প্রতিটি রিচার্জের ক্ষেত্রে “কত টাকা জমা হয়েছে—কী কী চার্জ কাটা হয়েছে—প্রতি ইউনিটের হিসাব কত—শেষ পর্যন্ত কত ইউনিট ক্রেডিট হয়েছে”—এই সম্পূর্ণ তথ্য সহজ ভাষায় দেখানো উচিত।
বিদ্যুৎ দফতরের কাছে গ্রাহকদের একাধিক প্রশ্ন
বর্তমানে ত্রিপুরার বিদ্যুৎ দফতরের দায়িত্বে রয়েছেন মন্ত্রী রতন লাল নাথ। সরকারি বিদ্যুৎ দফতরের তথ্যেও তাঁকে Power Department-এর মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—স্মার্ট মিটার ব্যবস্থায় যদি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বা অভিযোগ তৈরি হয়, তাহলে দফতরের পক্ষ থেকে কি প্রতিটি অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে?
গ্রাহকদের দাবি, শুধু নতুন মিটার বসালেই হবে না। মিটার কীভাবে কাজ করছে, রিচার্জের টাকা কীভাবে ইউনিটে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং কোনো অতিরিক্ত চার্জ থাকলে সেটি কীভাবে কাটা হচ্ছে—সবকিছু স্বচ্ছভাবে জানাতে হবে।
ইতিমধ্যেই টাস্ক ফোর্স গঠন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্মার্ট মিটার নিয়ে জনসাধারণের অভিযোগ ও প্রযুক্তিগত সমস্যার প্রেক্ষিতে ত্রিপুরা সরকার সম্প্রতি চার সদস্যের একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। এই কমিটির কাজ হচ্ছে স্মার্ট মিটার স্থাপন ও কার্যক্রম সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা, ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা।
এই সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায় যে বিষয়টি নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, তদন্তের ফলাফল যেন স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়। কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছে, কোথায় মিটার বা সফটওয়্যারের ত্রুটি রয়েছে এবং কোথায় হিসাব সঠিক—তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার।
রাজনৈতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নও উঠছে
বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা। ফলে বিদ্যুতের বিল বা প্রিপেড রিচার্জ নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি বারবার প্রশ্ন তৈরি হয় এবং তার দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে সরকারের প্রতি আস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
তাই বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কে না নিয়ে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে দ্রুত সমাধান করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্তই এখন মূল দাবি
গ্রাহকদের অভিযোগ সত্যি হলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং ভুলভাবে টাকা কাটা বা হিসাবের সমস্যা থাকলে তা সংশোধন করতে হবে। আবার যদি দেখা যায় যে রিচার্জের টাকা থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়ার পরই ওই ইউনিট ব্যালেন্স তৈরি হয়েছে, তাহলে সেই হিসাবও সাধারণ মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।
কারণ “টাকা দিলাম, কিন্তু কত ইউনিট পেলাম—জানলাম না” এমন পরিস্থিতি প্রিপেড বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
ত্রিপুরার মানুষের প্রশ্ন তাই খুবই সরল—রিচার্জের প্রতিটি টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং তার বিনিময়ে কত ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তার পরিষ্কার হিসাব কি গ্রাহক পাবেন?
এই প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর দেওয়া এখন বিদ্যুৎ দফতরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত ১৪, ৪০ বা ৯৭ ইউনিটের উদাহরণগুলি গ্রাহকদের অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মিটারের রিচার্জ হিসাব, প্রযোজ্য ট্যারিফ ও কর্তনের বিবরণ যাচাই না করে এগুলিকে চূড়ান্ত বা প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বিদ্যুৎ দফতর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

0 Comments